ঢাকা, ১৬ অক্টোবর, ২০২১ || ১ কার্তিক ১৪২৮
Breaking:
এটাও বাংলাদেশ, এটাই বাংলাদেশ:অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)     
Mukto Alo24 :: মুক্ত আলোর পথে সত্যের সন্ধানে
সর্বশেষ:
  কাল পর্দা উঠছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সপ্তম আসরের        সাম্প্রদায়িক অপশক্তি পরিকল্পিতভাবে মন্দিরে হামলা চালিয়েছে : ওবায়দুল কাদের        মনোয়ন ফরম বিক্রয় ৭টি কাউনিয়ায় আওয়ামীলীগের বিশেষ বর্ধিত সভা        খাদ্যের অপচয় না করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর     
২৮৪

মাদাম বোভারী :গুস্তাভ ফ্লবেয়ার

নয়ন মানস

প্রকাশিত: ২ জুলাই ২০২১  

মাদাম বোভারী :গুস্তাভ ফ্লবেয়ার-নয়ন মানস

মাদাম বোভারী :গুস্তাভ ফ্লবেয়ার-নয়ন মানস

নয়ন মানস :
ইউরোপের যে দেশ ও শহর নিয়ে আমি ফ্যান্টাসিতে ভুগি সেটা হল ফ্রান্স ও তার রাজধানী  শহর প্যারিস।এর পেছনে অবশ্য অনেকগুলো কারণ আছে। যখন থেকে সাহিত্য,শিল্প, রাজনীতি,দর্শন ও সংস্কৃতি নিয়ে আমার আগ্রহ তৈরী হচ্ছিল এবং কিছু বইপত্র পড়া শুরু করেছিলাম,তখন এ দুটো নাম প্রায়ই সামনে হাজির হত। এইদেশ ও শহরের রাজনৈতিক ঐতিহ্য,তার জনগণের শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস ও সাহিত্য,শিল্প, সংস্কৃতির প্রাচুর্য এবং একই সাথে প্যারিস শহরের থিয়েটার, পাব,সারি সারি দালান, ধনী অভিজাত লোকেদের গল্প শুনে এর প্রতি আমার প্রবল মোহ তৈরী হয়।সেটা এখনও বিদ্যমান।ফলে প্রায়ই সুয়োগ হলে ফরাসি লেখকদের লেখা পড়ি। খুব যে পড়েছি সেটা বলব না।বেশি জেনেছি অন্যের আলোচনা শুনে।এই কয়েকদিনে ইংরেজি অনুবাদে একটা ফরাসি উপন্যাস নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।যেটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি,সেটা আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি,কোন সর্বজনীন ব্যাপার নয়।এই উপন্যাস পড়ে একেক জনের একেক রকম উপলব্ধি হতে পারে।সেটা হওয়াই স্বাভাবিক।এইসব কথা মাথায় রেখে আমি যেটুকু ধরতে পেরেছি তা নিবেদন করি।


উপন্যাসের নাম মাদাম বোভারি এবং লেখক যথারীতি গুস্তাভ ফ্লবেয়ার।আমি ফরাসি জানি না, ইংরেজি অল্প অল্প বুঝি, কাজে চলার মত । যারা শিল্প সাহিত্য পড়েন ও চর্চা করেন আমি ধরেই নিচ্ছি আপনারা জানেন অনুবাদে সাহিত্য বিশেষত উপন্যাস ততটা আসে না। সাহিত্য অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি উপন্যাস ভাষার বৃহত্তর পরিসর নিয়ে কাজ করে। ফলে এর সাথে বিভিন্ন বিষয় জড়িয়ে থাকে, এর মধ্যে প্রধান পরিবেশ।সেটা অনুবাদে ঠিক আসে না। যেমন কোন ভিন ভাষার পাঠক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই পড়লে এই উপন্যাসের আসল মজাটা পাবে না।এই কথা মাথায় রেখে উপন্যাসটা দেখছিলাম।কিন্তু ফরাসি ভাষার উপন্যাস সেটা অনুবাদে হলেও এটা পড়ার বিপদ ও মজা আলাদা জায়গায়।উপন্যাসের প্রায় সবকিছু অনুবাদ করা গেলেও কিছু কিছু বিষয় অনুবাদ করা সম্ভব নয়।উপন্যাসের চরিত্রের নাম,বিভিন্ন জায়গার নাম,দোকান,পাব,রাস্তার নাম অনুবাদ করা সম্ভব নয়।ফলে ইংরেজি অনুবাদে হুবহু সেগুলো আসে। আর তখনই বোঝা যায় ফরাসি ভাষার মহত্ত্ব।ফরাসি ভাষায় শব্দ ও উচ্চারণের চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন সম্ভব নয়।শব্দের অক্ষর গুলোর দিকে তাকালে মনে হয় এক রকম আর উচ্চারণ করলে দাড়ায় আরেক রকম।ফলে ফরাসি ভাষা যারা জানে না তাদের পক্ষে এসব শব্দ বিপদজনক হয়ে দেখা দেয়। আমার ক্ষেত্র ব্যতিক্রম হয় নি। এসব স্বীকার করে নিয়ে উপন্যাসের আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

এ উপন্যাসটি মূলত একজন বিভ্রান্ত নারীর ভালবাসা খোজার গল্প। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র এমা বা মাদাম বোভারী।মাদাম ও মঁসিয়ে বোভারী দুজন দুজনকে ভালবাসে এই ধারণা নিয়ে বিয়ে করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মাদাম বোভারী তার এই ধারণার ত্রুটি আবিষ্কার করতে শুরু করে। মঁসিয়ে বোভারী এর আগে তার চেয়ে বয়সে বড় বিধবা ধনী নারীকে বিয়ে করেছিল জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। কিন্তু যথারীতি সে বিবাহ বন্ধনে সুখ ও পরিণতি ভাল হয় নি। তার স্ত্রী মারা যওয়ার পর সে ধীরে ধীরে এমা বা মাদাম বোভারী প্রেমে পড়ে ও বিয়ে করে।আগের বিয়েতে মঁসিয়ে বোভারী তার স্ত্রীকে ভালবাসতে পারেন নি। সবসময় এর থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা চিন্তা করেছেন।একইভাবে মাদাম বোভারীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে।প্রথমে সে ভেবেছে মঁসিয়ে অর্থাৎ চার্লসের প্রতি তার অনুরাগ প্রবল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারল তার ধারনা ভুল।সে আসলে চার্লসের উপর অনেক ধারনা আরোপ করেছিল।সে ভেবেছিল চার্লসের মধ্যে এমন সব গুণ ও বৈশিষ্ট্য আছে যা সে পছন্দ করে।কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তার মোহ ভঙ্গ হতে শুরু করল। তার পোশাক থেকে শুরু করে খাওয়া, ঘুমানো,ঘর সাজানো,শারীরিক আকৃতি,প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ,সাহিত্য,শিল্প,থিয়েটার সম্পর্কে জ্ঞান,এমনকি এমা অনুভূতিকে বোঝার ক্ষমতা সম্পর্কে যে ধারণা করেছিল তা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। ফলে এ বিবাহিত সম্পর্ক তাকে পীড়া দিতে শুরু করল। সে এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করতে শুরু করে। কিন্তু এ অস্বস্তিকর সম্পর্ক থেকে সে কীভাবে মুক্তি পাবে? সে সারাক্ষন ছটফট করতে থাকে। তার পক্ষে এরকম জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে তিন পুরুষের সান্নিধ্যে আসে ও তাদের ভালবাসে।তার মধ্যে দুজনের সে ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে আসে ও আরেক জনকে কাছে পাওয়ার আকাঙক্ষায় ব্যাকুল হয়ে পড়ে।রোদলফ ও লিয়নের মাধ্যমে সে চার্লসের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক অর্থাৎ যে সম্পর্কের মধ্যে কোন ভালবাসা ও আবেগ নেই তা ছেদ করার চেষ্টা চালায় কিন্তু ব্যর্থ হয়।অর্থাৎ মাদাম বোভারী চার্লস, রোদলফ ও লিয়ন এই তিন পুরুষের দ্বারা তার জীবনের শূর্ণতা পূরণ করতে চেয়েছিল কিন্তু সে পরোপুরি ব্যর্থ হয়।অপঘাতে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে তার আকাঙক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

চার্লসকে ভালবাসার সময় সে যে ভুল করেছিল লিয়নের ক্ষেত্রে তা সে করতে চায় নি। তাই প্রথমেই সে দেখতে চায় লিয়নের সাথে তার ভাল লাগা ও মন্দলাগার মিল অমিল কত খানি? ফলে আলাপের শুরুতেই তারা তাদের অনুভুতি বিনিময় করতে শুরু করে।তাদের দুজনেরই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ভাল লাগে,একজায়গা আবদ্ধ থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে,সাহিত্য,সঙ্গীত ও সর্বোপরি প্যারিসের থিয়েটার ও ধনী অভিজাত এবং তাদের অট্টলিকা তাদের দুজনেরই খুব পছন্দ।কিন্তু কোন মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।অচিরেই লিয়নের দূর্বলতা আবিষ্কার হতে শুরু করে। সে তার ভালবাসা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে বিদায় নিয়ে চলে যায়।আবার রোদলফ মাদাম বোভারীর জীবনে ঝড়ের মত আবির্ভাব হয়।তার ভালবাসা ছিল প্রচণ্ড দুর্দান্ত ও স্রোতের মত ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত।ফলে দুজন এটা তীব্রভাবে ভোগ করতে থাকে। এই ভোগ এক সময় আসক্তির পর্যায়ে পৌছে যায়।তাই দিনের এক বা দুই ঘণ্টা শুধু নয় তারা চব্বিশ ঘন্টা তাদের কাছে পেতে চায়।তখনই আসল বিপত্তিটা ঘটে।এখানে বলে রাখা ভাল লিয়ন ও রোদলফের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর আগে মাদাম বোভারীর একটা কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। এটাও মাদাম ও রোদলফের ভালবাসার মধ্যে একটা অন্তরায় সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও ভবিষ্যৎ অসুবিধার কথা চিন্তা করে রোদলফ কথার খেলাপ করে।যার ফলে মাদাম বোভারী প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক পীড়ায় পতিত হন।অবশ্য লিয়ন আবার ফিরে এসে সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। ভালবাসার মূল্য চুকাতে গিয়ে সে ঋণ করে ও ভূয়া ঋণের ফাদে পড়ে।কিন্তু পরিশোধের সময় লিয়ন ও রোদলফ কাউকে পাশে পান না,তারা দুজনেই তাকে সাহায্য করতে অস্বীকার করে।যার কারণে সে আত্নহননে বাধ্য হয়।

এই উপন্যাসে লেখক যেটা দেখাতে চান তাহল নারী পুরুষ ভালবাসার ক্ষেত্রে বরাবরই ভুল করে।নারী পুরুষকে আর পুরুষ নারীকে যদি ভুল ভাবে বিবেচনা বা পরিমাপ না করে তাহলে তাদের পক্ষে ভালবাসার সম্বন্ধে আবদ্ধ হওয়া সম্ভব না।কারণ একজন বাস্তব মানুষকে ভালবাসা কারও পক্ষে সম্ভব না।আইডিয়াল মানুষ ও প্রাকটিক্যাল মানুষের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।আর ভালবাসা বরাবরই আইডিয়াল।এটা সম্পূর্ণ মানুষের মনের ব্যাপার।মনের ব্যাপার যখন বাস্তনের রূপ ধরে সামনে হাজির হয়, তখনই সমস্যার শুরু হয়। সে তখন আবিষ্কার করতে শুরু করে আমি তার সম্পর্কে কতকিছু ভেবেছিলাম।এখন দেখি তার কোনটার সাথে কোনটার মিল নেই।আমি তার মধ্যে এমন এমন গুণ আরোপ করেছিলাম যার প্রায় কিছু তার মধ্যে নেই।তখন থেকে মোহ ভঙ্গ হতে শুরু করে।সে আবিষ্কার করতে থাকতে তার ভালবাসার মানুষ ঘুমের ভেতরে নাক ডাকে,ভাত খাওয়ার সময় প্রচণ্ড শব্দ করে, সে যে রং অপছন্দ করে সে রংয়ের পোশাক পড়ে,হিংসা বিদ্বেষ, পরনিন্দা পরচর্চা করে,মিথ্যা কথা বলে,ঘুষ দূর্নীতি ও চৌর্যবৃত্তি অভ্যাস আছে,এমনকি কিছুদিনের মধ্যেই তার উপর বিরক্ত হওয়া শুরু করে। এসব বিষয় ভালবাসার পূর্বে কারও ভেতরে আছে এটা জানতে পারলে কারও পক্ষেই ভালবাসা সম্ভব নয়।ফলে সবসময়ই মানুষ ভুল মানুষকে ভালবাসে।যার মূল্য অবশ্য ভালবাসার পর দিতে হয়। যেটা মাদাম বোভারীকে তিন তিন জনকে পুরুষকে ভালবাসার পর দিতে হয়েছিল।তিনবারই তার মোহ ও বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছিল।ফলে মৃত্যুর ভিতর দিয়েই সে তার মুক্তি খুজে নিয়েছিল।

এ উপন্যাসে আর যেসব বিষয় নজরে পড়ে তাহল লেখকের বাস্তব ও পরিমিত বোধ।তিনি কোন ঘটনা ও বিষয়কে অতিরঞ্জিত করেন নি।শিল্পের প্রয়োজন মেনে তিনি প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা নির্মাণ করছেন।কোন ঘটনা ও বিষয়কে তিনি আদর্শায়িত করেনি যাতে পাঠকের মধ্যে দ্বিধা ও অবিশ্বাসের তৈরী হয়।ফরাসি বাস্তববাদী ও প্রকৃতিবাদী উপন্যাসের এই অভিনব বৈশিষ্ট্য যা তাকে পৃথিবীর অন্যান্য উপন্যাস থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

 

নয়ন মানস

সাহিত্য সমালোচক ও গবেষক

 

 

মুক্তআলো২৪.কম

 

 

 

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত