ঢাকা, ০২ এপ্রিল, ২০২০ || ১৯ চৈত্র ১৪২৬
Breaking:
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      শামসুর রহমানের মৃত্যুতে এ্যাড.শামসুল হক টুকু এমপি`র শোক প্রকাশ      শামসুর রহমানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক     
Mukto Alo24 :: মুক্ত আলোর পথে সত্যের সন্ধানে
সর্বশেষ:
  বাংলাদেশে করোনায় নতুন করে আক্রান্ত ২, নেই মৃত্যুর খবর        বিএনপি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপতৎপরতায় লিপ্ত : ওবায়দুল কাদের        ছুটি বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি, অফিস খুলবে ১২ এপ্রিল     
৪৯৬

শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সেই স্মৃতি

প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯  

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. এএফএম আবদুল আলীম চৌধুরী। পুরো নাম আবুল ফয়েজ মোহাম্মদ আবদুল আলীম চৌধুরী। জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার খয়েরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে চারটায় শহীদ ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীকে রাজাকার-আলবদর বাহিনী তার বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় এবং সারারাত নির্যাতনের পর ভোররাতে মেরে ফেলা হয়। এরপর ১৮ ডিসেম্বর রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ডা. আবদুল আলীমের ক্ষত-বিক্ষত লাশটির সন্ধান পাওয়া যায়।

বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বাসা থেকে ডা. আলীম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা গণমাধ্যমকে বলেছেন তার স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী।

‘সেদিন ছিল ১৫ ডিসেম্বর। তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। আমরা আমাদের বাড়ির দোতালার বারান্দায় বসে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণ প্রত্যক্ষ করছিলাম। রেডিওতে তখন বারবার পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলার খবর প্রচার করা হচ্ছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কোনও বাধা দিতে পারছে না। রেডিও শুনে এবং এসব ঘটনা দেখে আমাদের মনে হয়েছিল বিজয়ের আর বেশি বাকি নেই। আমরা ভেতরে ভেতরে উল্লসিত ছিলাম। ৯ মাসের নির্যাতনের অবসান হবে ভেবে আমরা আনন্দ বোধ করছিলাম।’

‘ভারতীয় মিগ যে বোমাবর্ষণ করছিল, তা দেখে আমাদের মধ্যে কোনও ভয় কাজ করছিল না। কারণ তারা তো সাধারণ জনগণের ওপর বোমা ফেলছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিসমূহ। আমার স্বামী ডা. আলীম চৌধুরী তখন হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘দেখ আকাশটা যেন ভারতীয় আকাশে পরিণত হয়েছে।’

‘আমাদের বাসার নিচের তলায় থাকত আলবদরের সংগঠক মওলানা আবদুল মান্নান। তাকে উদ্দেশ করে তিনি বলছিলেন, ‘মান্নানরা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ওরা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর এসে ওদের বাঁচাবে। কিন্তু ওরা বুঝতে পারছে না আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বা আমরা বিজয় লাভ করব।’ এটা বলেই তিনি হো হো করে হাসছিলেন। আমিও সেই হাসিতে যোগ দিয়েছিলাম।’

‘ভাবতেই ভালো লাগছিল যে, আমরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। এই সময় একটা গাড়ির শব্দ পেলাম আমরা। কাদামাটি দিয়ে লেপা একটি মাইক্রোবাস আমাদের পুরানা পল্টনের বাসার সামনে থামল। গাড়িটা মান্নান যে অংশে থাকত, সেই অংশের সামনেই থামল। আমরা তেমন শঙ্কিত হলাম না। কেননা, তার কাছে প্রায়ই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকজন আসত এবং অনেকক্ষণ থাকত। আমার স্বামী শুধু বললেন, ‘বেশি উঁকি-ঝুঁকি মেরো না। ভেতরে চলে এসো।’

‘আমরা সবাই তখন ভেতরে চলে গেলাম। ওরা মান্নানের বাসায় ২৫-৩০ মিনিট থাকার পর উপরে উঠে এলো এবং আমাদের দরজায় প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিতে লাগল। দরজায় মনে হয় প্রচণ্ড জোরে লাথি মারছিল আর পরিষ্কার বাংলায় বলছিল, ‘দরজা খুলুন।’ আমি তখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম যে, কয়েকজন আলবদর দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। মান্নানের দরজার সামনে সবসময় আলবদরের পাহারা থাকায় আমরা তাদের পোশাক চিনতাম। নীল শার্ট আর ছাই রঙের প্যান্ট তাদের পরিধানে ছিল। আলবদরদের দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। আমার স্বামীও ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তার মুখটা কালো হয়ে গিয়েছিল ‘

‘তাকে আমি বললাম, ‘এখন কী হবে? ওরা তো দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।’ তিনি নিরূপায় হয়ে বললেন, ‘খুলে দাও। খুলে না দিলে তো ওরা ভেঙে ঢুকে যাবে।’ ওরা ভেঙে ঢুকলে তো গুলি চালাতে পারে। বাসায় তো আমাদের বাচ্চারা রয়েছে। ওদের বয়স তখন ২-৩ বছর। আলীম তখন দৌড়ে নিচের তলায় যাওয়ার চেষ্টা করলেন। নিচের তলায় মান্নান থাকত। কিন্তু যাওয়ার জন্য যে দরজাটা সবসময় খোলা থাকত, সেটা বন্ধ ছিল। অনেক ধাক্কাধাক্কির পর মান্নান দরজাটা একটু ফাঁকা করে বললেন, ‘আপনি যান। কোনও সমস্যা নেই।’ তখন তিনি নিরূপায় হয়ে ফিরে এলেন। ফেরার আগে কাজের ছেলেদের দরজা খুলতে বললে তারা তা খুলে দেয়। ওরা ভেতরে ঢুকে আলীম চৌধুরীকে দেখে বলে, ‘হ্যান্ডস আপ।’ ওদের কেউ জিজ্ঞেসও করল না, আলীম চৌধুরী কে? কারণ, আলীমকে মান্নান আগে থেকেই চিনিয়ে দিয়েছে।’

‘আলীম তখন বলল, ‘আমি কাপড় পরিবর্তন করে আসি।’ ওরা দরকার নেই বলে আলীমকে ওই অবস্থায় নিয়ে গেল। আমি তখন মওলানা মান্নানের কাছে ছুটে গেলাম। খেয়াল করলাম একতলায় যাওয়ার দরজাটা খোলা রয়েছে। আমি তাকে বললাম, ‘তাকে তো কয়েকজন ধরে নিয়ে গেছে। আপনি কিছু করেন।’ সে প্রথমে উত্তর না দিলেও আমি ক্রমাগত অস্থিরতা দেখানোয় বলল, ‘চিন্তা করবেন না। চারিদিকে তো বোমাবর্ষণ হচ্ছে, ওরা তাকে সিএমএইচে নিয়ে গেছে। ডা. ফজলে রাব্বীকেও নিয়ে গেছে।’

‘কিন্তু… আলীম চৌধুরী আর ফেরেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই-তিন দিন পর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে ডা. রাব্বীর পাশেই তার লাশ পাওয়া যায়।’

ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী কিশোরগঞ্জ জেলার খয়েরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোরগঞ্জ হাই স্কুল থেকে ১৯৫৪ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে আইএসসি পাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং ৫২-র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

পেশাগত জীবনে আবদুল আলীম চৌধুরী ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত লন্ডনের সেন্ট জেমস হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে তিনি মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে যোগ দেন প্রধান চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে। ঢাকার পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন তিনি ১৯৬৭ সালে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৮ সালে। এরপর কিছুদিন ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগে। তার সর্বশেষ কর্মস্থল ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ।

 

মুক্তআলো২৪.কম

 

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত