ঢাকা, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ || ৪ কার্তিক ১৪২৬
Breaking:
Mukto Alo24 :: মুক্ত আলোর পথে সত্যের সন্ধানে
সর্বশেষ:
১০৮৫

বিনু মাহবুবা`র গল্প- `একজন সম্পুর্ণ মানুষের গল্প`

বিনু মাহবুবা

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর ২০১৪   আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪

রিক্সা থেকে নামতেই চোখ গেলো সুখের রিক্সা চালকের দিকে সেকি; ওর তো হাত দেখা যাচ্ছে না ? তাহলে কি দিয়ে এতোক্ষন সে ......মাই গড ...এতোক্ষণ একবারো চোখে কেনো পড়েনি এই ভেবে সুখের

নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো ।

আপনি এমন করে রিক্সা চালান যে কোন সময় যদি ...

না, কিছু হয়নাই এযাবত, আর হইলে কি করি কন ? পেট যে বুজে না ।

আছে কে আপনার আর ?

আছিলোতো সবাই, এখন আসেপাশে কেউ নাই ।

মানে ? আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে ?

ছিলো কবে যে ছাইড়া যাইবো !

আপনি ঠিক করে বলেন আর ভালো কথা কতো দেবো আপনাকে ?

দেন আপনের যা মনে হয় ঠিক ভাড়া ...শোনেন আফা, আপনেরে আফা ডাকলাম, একদিন সবাই আছিলো,যুদ্ধ হইছিলো এই দেশে শুনছেন ? নানা আমি মুক্তিযোদ্ধা না...আমি যদি এখন আমার কাহিনি আপনেরে কই অ্নেক সময় লাইগা যাইবো, আমার আর তাইলে আজকে খাওয়া হইবোনা ,আপনি হইলেন প্ররথম পেসেঞ্জার ।

ওহ আচ্ছা , তাহলে আজ থাক আমি কিন্তু শুনবো আপনার কথা ,শোনেন এই আমার বাসা আপনি আসবেন একদিন ?

সত্যি আপনে শুনবেন ? তাইলে আসুম যান।

দরজায় বেল বেজে উঠলো শুক্রবার দুপুর জুম্মার নামাজের পরে ,সময় তখন প্রায় তিনটা !

দুপুরে খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে একটু চোখে তন্দ্রা এসেছিলো সুখের। ধীর পায়ে দরজরা দিকে এগিয়ে গেলো...খুলে বেশ অবাক ...

আরে; আপনি এসেছেন ?

আফাঃ কথা দিছিলাম আসুম তাই,আপনের ডিস্টাব হইবো না তো ?

আরে না না কিযে বলেন আমি তো ফ্রী আছি আজ, বসেন ।

চলে এলো রিক্সার চালককে নিয়ে বসার ঘরে। ছোট ছিমছাম চারখানা বেতের চেয়ার ।দেয়ালে একখানা বাঁধানো ছবি সুখের, পাশে একগোছা মানিপ্ল্যান্টের গাছে ডাল ,এইতো একজনার বাস উপযোগী বেঁচে থাকবার ব্যবস্থা ।

আপনি বসুন আমি চা নিয়ে আসছি কেমন ?

চায়ে জল চাপালো চূলোয় তারপর ফিরে এলো বসবার ঘরে ...

আপনি যেনো কোথায় থাকেন ?

এইতো শোলশহরের কাছে দুইনম্বর গেইট সেই ধারেই ।

ওহ কাছেই তো তাহলে ।

বলতে বলতে জলে চা পাতা দেবার সময় হয়ে গেছে টের পেয়ে আবার কিচেনে ...

নিন, চা আর এই চানাচুর,ঘরে আজ আর কিছু নেই বাইরে যেতে হবে কিনতে,কিন্তু মন চাইছেনা আজ শুধু আপনার কথা শুনবো বলেন এবারে...

সেই সময়ডা ছিলো ৭১ সাল ভাইবেন না আমি মুক্তি যোদ্ধা; আমি যুদ্ধ করিনাই ,অস্ত্র হাতে নেই নাই আবার ডাকাইত ও না তাইলে ভাবছেন হাত দুইডা নাই কেন?

না আফা,আমার বয়স তখন ১০/১২ হইবো, গ্রামে আমাদের বাড়িতে আছিলাম ।এই মুড়াপাড়া ঢাকার মুড়াপারার নাম শুনছেন ? যাত্রাবাড়ির পরে ওইযে কাচপুর ব্রীজের কাছেই

তখন যুদ্ধ চলে মনে হয় মাঝামাঝি সময় এই ধরেন সেপটেম্বর কি অক্টোবর হইবো ।

আমি স্কুলে যাইতাম ক্লাস ফোরে পড়তাম। গ্রামের স্কুল তো বন্ধ দিয়া দিছিলো,ক্যাম্প বানাইছিলো স্কুলে মিলিটারিরা।আমার পরিষ্কার মনে আছে___

দুইজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধা একজনের নাম সাত্তার,আরেকজন মাস্টার ডাকতো সবাই ,শুনছি ওনারা নাকি সর্বহারা দল করতো । ওনারা কি ব্যাগে ভইরা নিয়া আসতো আমাগো বাড়ির গাছ-গাছালির আড়ালে আবডালে রাইখা যাইতো । আবার এক সময় আইসা নিয়াও যাইতো।

আপনার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে ---

এক রাইতে আমাগো গেরামে মিলিটারি আইলো; তার আগের রাইতে আমি দেখছি ওই দুইজন আইছিলো আমাগো বাড়িতে, কি যেন কইলো আমার মায়ের সাথে তার পর চইলা গেলো ।

হের পরের দিন সকালবেলায় দেখি মিলিটারি গিরা ফালাইছে আমাগো বাড়ি ।

মিলিটারিরা আইসা বাড়ির সব কিছু ঘাটাঘাটি কইরা দেখলো এরপরে গাছগাছালির দিকে আজ্ঞাইতে লাগলো আমার তো ভয়ে বুক ধরপর করতে শুরু কইরা দিছে ।আমি তো জানি ওনারা যে কি রাইখা গেছে ! ঠিক যায়গা মতো যাইয়া তারা সব আউলা ঝাউলা কইরা পাইয়া গেলো লুকাইন্না অস্ত্র, স্টেনগান আমি এই পরথম দেখলাম আর নাম ও শুনলাম। মায়ে তো লুকাইয়া গেছিলো পাশে মামীগো বাড়ি ,এখন সামনে পাইলো আমারে ___

ধইরা কানের মধ্যে এমন এক বারি দিলো আমি মনে করছি মইরাই গেছি ...

একটু পরে আমার হাতের মইধ্যে বারি দিয়া ছেইচা দিলো ডান হাত এরপর বাম হাত । শেষমেশ আগুন লাগাইয়া দিয়া হেরা চইলা গেলো ।আর হের কিছুদিন বাদে আমার অপারেশন হইলো হাত কাইটা ফেলান লাগবো ডাঃ সাহবেরা কইলো । একদিন হাসপাতালে ভর্তি ও করলো গেরামের মানুষ ,আর আমি হাত কাটা এক হাকিম হইলাম।

ওহ আপনার নাম হাকিম ?

হুম । এহন কন আমি কেমনে কই যে আমি মুক্তিযোদ্ধা ? আমি তো অস্ত্র নিয়া যুদ্ধ করিনাই । আমার লেখা পড়া ও আর হইলোনা ।বাড়িঘর জালাইয়ে দিলো ওরা হের পরে আর কি থাকে কন ?আবার বাঁচার পালা এখন পেট বাচামু না লেখা পরা করমু ?হেই ছডোকাল থেইকা কষ্টে কষ্টে আছি।গ্রাম ছাইরা মারে নিয়ে আইসা পড়লাম চিটাগাং পাহাড়ে । সেই সময় পাহাড়ে বাঙ্গালীগো এমনেই থাকতে দিছিলো ।সেই থেইকা এই দেশে ই আছি ।রিক্সা চালাই খাই এইতো ।

আপনার পরিবার আছে ?

আছে আফা, মা ডা মইরা গেছে ,জানেন একদিন ও মায়রে মুখে হাসি ফুটাইতে পারিনাই । দুইডা ভাত ঠিক মতো দিতে পারিনাই আর কি হাসি দিমু কন ?এখন বউ আর এক মাইয়া লইয়া কাইটা যায় দিন। বউ এক বাড়িত রান্ধার কাজ করে আমি রিক্সা চালাই।ভয়ে ভয়ে থাকি ,কিছু দিতে পারিনা কি যেন কবে ছাইড়া যায় গিয়া !

আচ্ছা হাকিম ! আপনার কাছে কেউ আসেনি আহত মুক্তিযোদ্ধার লিস্ট করার জন্যে নাম নিতে ?

না আফা ,কি কন আমি কইলাম না আমি তো যুদ্ধ করিনাই ?

না না ঠিক আছে যুদ্ধ করেন নি তা ঠিক কিন্তু আপনি বা আপনার পরিবার তো যুদ্ধের কারনেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন ? আর ওরা আপনার হাত কেনো কেটে দিলো তা তো বললেন না ?

ওহ, জিগাইছিলো এই যন্ত্র কারা রাখছে ? আমি কইছি জানিনা । কইলো জানাইয়া দিলে আমারে কিচ্ছু করবোনা ,আমি কইলাম আমি জানিনা, দেখিনাই । এর পরেই আমারে ধইরা হাত ছেইচা দিলো।

সেই জন্যেই বলছি এই যে আপনি বলে দিলেন না ,আপনি তো সাহায্য করলেন তাইনা মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচালেন তাই না ?হয়তো বলে দিলেও তারা আপনার হাত ছেঁচে দিতো কিন্তু আপনি এতো ছোট একটা ছেলে এতো সাহস করে বললেন জানিনা ! এমন তো অনেক বয়স্ক মানুষ ও করেনি বরং আরো অসহযোগীতা করেছে ,লুটপাট,অশ্লীলতা ,খুন এবং পাক হানাদারদের সাহায্য করেছে । অথচ আপনি কতো ছোট একজন শিশু হয়েও কতো বীরের পরিচয় দিয়েছেন ,আপনাকে কেউ চেনেনা জানেনা ।

আফা, ঘরে যদি ডাকাইত আসে আমরা কি বইসা থাকি কারো লাইগা নাকি ঝাপাইয়া পড়ি ? আমি আমার দেশের লাইগা কি করছি হের লাইগা আবার টেকা বা সাহায্য নিমু ? এইডা কি কন আফা, না আমি পারমুনা ।

হাকিম ,আপনার মতো এমন ভাবনা যদি আমাদের সবার হতো তাহলে আমরা আজ এতো অবিবেচক জাতি হিসেবে পরিচিত হতাম না ,আপনার কাছে শিক্ষার অনেক কিছু আছে আমাদের বড় বড় মানুষদের, যারা দেশের-দামি-দামী ব্যাক্তি হিসেবে পরিচিত ।

আমরা দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি কি ঘরের ভেতরে কি বাইরে। আপনাকে আমার হাজার সালাম হাকিম । আপনি আসবেন আমার বাসায় আপনার বউ বাচ্চা নিয়ে বেড়াতে আসবেন । আপনাকে আমি কোনো সাহায্য করবোনা তাহলে আপনাকে ছোট করে দেয়া হবে । আপনাকে আমি একটা রিক্সা কিনতে টাকা ধার দেবো কেমন ? আপনার নিজের রিক্সা হবে সেটা আর আপনি মাসে মাসে আমার টাকা শোধ করে দেবেন কি নেবেন ?

আফা, এইসব কি কন ।আমার আবার নিজের রিক্সা ? আর আমি পারমু টাকা শোধ দিতে ?

কেনো ? আপনি রোজ কতো আয় করেন ?

তা ধরেন চাইর/পাচশ তো করি তয় খরচ যায় রোজ তিনশ টাকার মতো আর এই এদিক সেদিক...

ঠিক আছে আপনার একটা একাউন্ট করে দেবো ব্যাঙ্কে ঠিক আছে ? আপনি প্রতিদিন সেই ব্যাঙ্কে একশত টাকা করে রাখবেন ।আমি মাসের শেষে তিন হাজার টাকা নিয়ে নেবো হবে ? এভাবে শোধ হয়ে যাবে টাকা ।

আফা , আমি তো ভাবি নাই কোনদিন এই সব ,আমারে একটু সময় দেন আমার পরিবারের লগে একটু কথা কইয়ে দেখি আমি আপনেরে জানামু কাইলকা । যাই আফা বাড়িত যাই আপনে ভাল থাইকেন আফা ,আপনে অনেক ভালা মানুষ ।

চলে গেলো হাকিম আলী ...দরজা বন্ধ করে দিলো সুখ , চোখ বন্ধ করে ভাবছে আর মনের চোখে ভেসে উঠছে নিজের বাবার কৃতকর্ম । যা জীবনেও কাউকে বলেনি কোনোদিন ভুল করেও।সুখের বাবা কোনদিন চায়নি এদেশ স্বাধীন হোক। সাহায্য তো দূরে থাক তিনি শুধু অসহোযোগীতাই করেন নি এমন সব কাজে ইন্ধন যুগিয়েছেন যা মুখে আনলেও পাপ হয় সুখের গোটা পরিবারের। এসব নিজের মায়ের কাছে শুনেছে সুখ। সেই থেকে একাকীত্বের জীবন বেছে নিয়েছে ,আর এভাবেই চলে যাচ্ছে মানুষের চোখের আড়ালের জীবনে আনাচে কানাচে নিজেকে লুকিয়ে পাপের বোঝা কাঁধে নিয়ে নিজের জন্মদাতার পরিচয় ।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত