ঢাকা, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ || ২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
Breaking:
Mukto Alo24 :: মুক্ত আলোর পথে সত্যের সন্ধানে
সর্বশেষ:
  বুধবার ৪-ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করার নিমিত্তে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেলা ১২টায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো `বাঙাালির অহংকারঃ বঙ্গবন্ধু ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ` শীর্ষক আলোচনা সভা ।        স্বাস্থ্য সামগ্রী বিতরণ রোটারী ক্লাব অফ ঢাকা জেনারেশন নেক্সট এর ছাত্রীদের মাঝে     
২১৩০

আকাশে পাখিরা ধর্মঘট করতে চাইলে আমরা বাধা দেবার কে?

রেজওয়ান তানিমের সাথে কথোপকথন ,সাক্ষাৎকার গ্রহণঃ পাভেল আল ইমরান

প্রকাশিত: ১৫ মে ২০১৪   আপডেট: ১২ জুন ২০১৪

রেজওয়ান তানিম

রেজওয়ান তানিম

লেখক পরিচিতিঃ
রেজওয়ান তানিম এ সময়ের একজন তরুণ কবি। লেখালেখির মূল প্রেরণার জায়গায় রয়েছে কাব্যচর্চা। পাশাপাশি ছোট গল্প ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ রচনাতে রেখেছেন দক্ষতার সাক্ষর। আগ্রহের জায়গায় রয়েছে বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যের বিশ্বায়ন।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
কাব্যগ্রন্থ: মৌনমুখর বেলায় (প্রকাশক: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন)

           শাদা পরচুল অন্ধকার (প্রকাশক: অনুপ্রাণন প্রকাশন)

গল্প সংকলন: অবন্তি (প্রকাশক: ভাষাচিত্র প্রকাশন)

কবিতা সংকলন: ‘In Praise-In Memory-In Ink’ (আন্তর্জাতিক সংকলন) Blurb Publication, Canada.

                       `In Our Own Words` (আন্তর্জাতিক সংকলন) Blurb Publication, Canada.

                      `Heavens Above Poetry Below` (আর্ন্তজাতিক সংকলন) Blurb Publication, Canada.

সম্পাদিত গ্রন্থ: শাহবাগের সাথে সংহতি (ই-বুক)

সম্পাদিত পত্রিকা: লিটল ম্যাগ লিপি (২য় ও ৩য় সংখ্যা)

                    ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র “অনুপ্রাণন”

প্রশ্ন : আপনার নতুন কবিতার বই বের হয়েছে শুনলাম। গ্রন্থের নাম `শাদা পরচুল অন্ধকার` নামকরণ কেন করলেন ? এর পেছনের কথা কী,অথবা নামের উদ্দেশ্য কী?

 

উত্তরঃ ধন্যবাদ আপনাকে। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আমার এবারের কাব্যগ্রন্থের নাম “শাদা পরচুল অন্ধকার”। এই নামে গ্রন্থে একটি দীর্ঘ কবিতা আছে যার প্রথমাংশ সম্ভবত এই পত্রিকাতেও (ক্ষেপচুরিয়ান্স) প্রকাশ হয়েছিল। যাই হোক, এই নামকরণের পিছনে কেবলমাত্র দীর্ঘ বা সিরিজ কবিতাটিই ভাবনার জায়গায় ছিল এমনটি ভাবলে ভুল হবে। শাদা পরচুল অন্ধকার নামটিকে আমি একটি প্রতীক হিসেবেই দেখছি, যা আমাদের চলমান সময়ের অবক্ষয় ও আশাবাদের জায়গাগুলো নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করে যাচ্ছে।  হতে পারে তার দেখার চোখ ভুল কিংবা তার বিশ্লেষণ ভ্রান্ত কিন্তু তবুও সে কিছু একটা দেখছে, ভাবছে এইটিই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকদিন আগেই বলেছি এ প্রসঙ্গে, সমাজে যা কিছু আলোকিত, তাকে ভিন্নচোখে দেখার এই প্রচেষ্টা সকলকে ভাবাবে আশা রাখছি।

প্রশ্ন:কতটি কবিতা আছে আপনার বইয়ে ?

 

বইয়ে প্রধান উপজীব্য হিসেবে এসেছে তিনটি দীর্ঘ কবিতা। যে তিনটির নাম সকালগুলো অসমাপ্ত, দুঃখ প্রস্থান ও অসুখী ঠোঁট এবং শাদা পরচুল অন্ধকার। বাকি কবিতাগুলো একক কবিতা হলেও এই তিনটি কবিতার সাথে বেশিরভাগই বিষয় ও ভাবনাগত সাদৃশ্য নিয়েই সহাবস্থান করছে এই বইয়ে। তিনটি দীর্ঘ কবিতাসহ মোট ৩০ টি কবিতা আছে বইয়ে।

প্রশ্ন: কোন ঘরনার কবিতা নিয়ে সাজিয়েছেন `শাদা পরচুল অন্ধকার`?

 

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, একজন কবি কিভাবে ঘরানা মেনে কবিতা লেখেন আমার জানা নেই। কবিতা কোন পারফর্মিং আর্ট (যদিও তাকে পারফর্ম করা হয়, আমি নিজেও করি; তবে যা করা হয় কবিতা আর কবিতা থাকে না, তা হয়ে যায় নির্মাণ) নয় যে তাকে দীর্ঘদিনের চর্চা বা একই ধারায় লিখে গেলে একদিন ভালো একটা লেখা বের হবে। একজন কবি শারীরিক ও মানসিক বিবেচনা এবং পারিপার্শ্বিকতার বিচারে যাকে কবিতা মনে করবেন তাই লিখবেন, আমি এরকমই মনে করি। এই বইয়ের কবিতাগুলো বিগত তিন বছরে আমার ভাবনা, কাব্যিক দর্শন, সমাজচিন্তা ও রাজনৈতিক চেতনার একটা প্রকাশ। 

প্রশ্ন`শাদা পরচুল অন্ধকার`র বিষয়বস্তু কী?

 

শাদা পরচুল অন্ধকারের বিষয়বস্তু এক বাক্যে যদি বলি তবে তা হল সমাজ। আমাদের সামাজিক রীতিনীতি, প্রাত্যহিক ক্রিয়াযজ্ঞের ভেতরের রূপটাকেই তুলে ধরতে চেয়েছি এই কবিতায়... এই কবিতাটি সম্পর্কে অনুপ্রাণন সাহিত্য পত্রিকায় স্কাইলাসের লেখা আলোচনার কিছু অংশ তুলে ধরছি, যা শাদা পরচুলের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা দেবে।

রেজওয়ান তানিম এর সাম্প্রতিক রচিত ‘শাদা পরচুল অন্ধকার’ কবিতাগুচ্ছে অনুভূতি ও উপলব্ধির ক্যানভাস আরো প্রসারিত হয়েছে, আরো গভীর হয়েছে সমাজ, পরিবেশ, জীবন এবং পরিচয়ের বিচিত্রতা ও বৈপরীত্য প্রকাশের বিস্তৃত অঙ্গনে। এই বিচিত্রতা ও বৈপরীত্য প্রকাশের জন্য রেজওয়ান তানিম এই কবিতাগুচ্ছে দুটো  প্রতীককে খুব সফলতার সাথে ব্যবহার করেছেন। একটি , ‘শাদা পরচুল’, আর একটি হচ্ছে ‘বাণ মাছ’। কবিতার মধ্য দিয়ে বক্তব্য প্রকাশের প্রয়োজনে কখনো এই প্রতীক দুটোকে দাঁড় করিয়েছেন মুখোমুখি, পাশাপাশি অথবা আবার কখনো বাণ মাছ এসেছে একা, নিঃসঙ্গ নাহয় অন্য কোন তৃতীয় সবলতর প্রতিপক্ষের প্রবল উপস্থিতিতে বিপন্ন ও অসহায়।

আমরা জানি, মানবসভ্যতার ইতিহাসে অভিজাত শাসক অথবা বিচারক শ্রেণির নারী ও পুরুষদের পরচুলার ব্যবহার ফেরাউন ও রোমান সম্রাটদের সময় থেকেই প্রথমে প্রচলিত হয়। পরবর্তীকালে, পরচুলার ব্যবহারে ভাঁটা পরলেও এই প্রবণতা ভিক্টোরিয়ান আমলে ইউরোপের অভিজাত, বিচারক ও আইনবিদদের মাঝে পরচুলা, বিশেষ করে শাদা পরচুলার ব্যবহার আবার ফিরে আসে, অভিজাত শ্রেণি-শাসক ও বিচারকদের মাথায় এবং উপনিবেশবাদী ধারায় সওয়ার হয়ে এই প্রচলন ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোতেও চালু হতে দেখা যায়, যার অপভ্রংশ এখনো এককালের ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসাবে আমাদের দেশেও এর কিঞ্চিত দেখা মেলে, বিশেষ করে আদালতের অঙ্গনে, বিচারকের আসনে। কবিতাগুলোতে শাদা পরচুলা এসেছে কখনো শাসক, কখনো শোষকের চরিত্রে, সুন্দর ও সাধারণের জীবনের প্রবল প্রতিপক্ষের রূপক চরিত্রে।

প্রশ্ন:সাহিত্যের ক্ষেত্রে আপনি কাকে আপনার জীবনের আদর্শ ভাবেন ?

 

বিগত বছরগুলোতে লেখালেখির ক্ষেত্রে কি করতে পেরেছি জানি না, তবে কবি লেখক হিসেবে যারা এ সময়ে আমাদের কাছে পরিচিত তাদের অনেকের সাথেই নানা সূত্রে মেলামেশা করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় কাউকেই জীবনাদর্শ হিসেবে নিতে পারিনি। আপনি জানেন বোধহয়, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র; আমরা পদার্থ বিজ্ঞানে এক ধরণের কল্পিত গ্যাসের কথা পড়ি, যা খুব সুন্দর সুন্দর বৈশিষ্ট্য দেখায় কিন্তু সত্যিকারে বাস্তবে থাকে না। আমি মনে করি কবি লেখকেরা তাদের লেখনীতেই আদর্শ, অনেকটা গ্যাসের মতই। কিন্তু তারা আদর্শ মানব নন। আদর্শ মানুষ একটি ধারণা, যা কবিদের পক্ষে হওয়া কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। কেননা কবিকে হতে হয় সাধারণের মাঝে অসাধারণ। স্বপ্ন ভরা মনই কবিত্বের পরিচয় নয়, হিংসা, দ্বেষ এগুলো কবি মানুষের মাঝে প্রবল ভাবেই বিদ্যমান। আর কবি কবি হয়ে ওঠেন কারণ তিনি প্রকাশ করতে জানেন, লেখনীতে। সাহিত্য সংশ্লিষ্ট কাউকে জীবনাদর্শ করতে না পারলেও আজকাল ভাবছি ভিন্ন কারো কোথা। মাঝে মাঝে মনে হয়, লেখার বাইরে আমার আর কিছু না করে বুদ্ধ কিংবা যিশুর মত নির্বাক হওয়া উচিত, অন্তত লোকালয়ে। এই আদর্শই অনুসরণের চেষ্টা করছি আপাতত বলতে পারেন।

প্রশ্ন:কোন কবির প্রতি আপনি অতিমাত্রায় দুর্বল ,যার ছাপ আপনার লেখায় প্রায়ই পড়তে চায় ,পড়ে যায় ?

 

কবিতা লেখা শুরু করেছি যখন তখন যার কবিতা পাঠ করে প্রেরণা পেয়েছি লেখার তিনি হলেন রবিঠাকুর। শুরুর সময়টাতে কেন যেন ওর কবিতা বাদে কারো কবিতা ভালো লাগত না। সে সময়ে আমার উপরে রবীন্দ্র প্রভাব ভালো ভাবেই পড়েছিল, কাটিয়ে ওঠাও কঠিন ছিল। এরপরে  সবসময়েই চেষ্টা করে গেছি নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে প্রকাশের।  আর এখনো বহু কবির কবিতা ঈর্ষা জাগায়, আপ্লুত করে তবে তাকে অনুসরণ না করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চাই ভাব গ্রহণ করে।

প্রশ্ন:দশক বিভাজন নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছে। আপনি কি দশক` নীতি সমর্থন করেন ? নিজেকে কোন দশকের কবি দাবি করেন ?

 ইদানীং আশে পাশে দশক চর্চা নিয়ে খুব কথা উঠেছে তাই ওই নিয়ে কিছু কথা বলি। অনেকে আছেন যারা মনে করেন আধুনিক কবিতা লেখার জন্যে দশকিয়া রীতি বুঝি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে যে কোন একটি দশকের স্রোতে ঢুকানো কবি লেখকের অবশ্য কর্তব্য। এ ধারনাটি আমার কাছে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। কেননা বাংলা সাহিত্যে এই রীতির প্রবর্তন ত্রিশের দশক থেকে শুরু হলেও বিশ্ব সাহিত্যে দশকীয় রীতির এত ব্যাপক প্রচলন আছে কিনা জানা যায় না। বাংলা সাহিত্যে সমকালীন কবি লেখকেরা অনেকেই একে যে ভাবে দেখেন তাতে মনে হয় কবি বা লেখক হবার এটাই প্রধান শর্ত। একটা নির্দিষ্ট দশক ধরে চলতে হবে আপনাকে, সে দশকের সব কটি সংকলনে অংশগ্রহণ করা চাই। যদিও আমি বিশ্বাস করি যারা সৃষ্টিশীল কবি এতে খুব বেশি আশা যাওয়ার কিছু নাই তাদের। দশকিয়া ধারা আমার মতে মোটামুটি ব্যর্থ একটা জিনিস যা সাহিত্যে নতুন ধারা তৈরি বা বাঁকবদলের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি। কেননা দশ বছরের মত স্বল্প সময়ে কোন ভাষাতেই কবিতার আঙ্গিক বা কাঠামো বদলের নজির নেই। মগজের উপনিবেশ গত কারণে যাদের আমরা আমাদের সাহিত্যের পুরোধা মনে করি তাদের সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ভিক্টোরিয়ান এজ, ক্লাসিক্যাল এজ এভাবে প্রবণতা অনুযায়ী দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ভাগ করে সাহিত্যের সুরবিচারে। বাংলা সাহিত্যে ত্রিশের দশক বলে যে আমরা রবিবলয়ের বাইরের প্রথম কণ্ঠস্বরকে চিহ্নিত করি, সেই ত্রিশের দশকের কবিদের কবি হিসেবে চিনতে সমর্থ হয়েছি মধ্য চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ দশকের সময়ে। অতএব আমার বিবেচনায় কবিদের জন্যে এটা তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

এটা খুবই সত্যি-কবিতা কোন এক দর্শীয় চিন্তার বিষয় না, আর এখানেই এত বিভক্তি। দশকিয়া চর্চা কবির কাছে মূল্যহীন লাগলেও সমালোচক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সময়ের সত্যিকারের কবির ফর্দ করতে গেলে কিন্তু দশকের কাছে আশ্রয় নিতে হয়। এর কারণ যারা দশক রীতি প্রচলন করেছিলেন তারাই কোন না কোন ভাবে একে গুরুত্বপূর্ণ করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের আমল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যুগ সন্ধিক্ষণ, ক্লাসিক কিংবা রোম্যান্টিক ধারা প্রবল আকারেই ছিল। ওর থেকে নিজেদের পৃথক করতেই বুদ্ধবাবু ও তার সমমনা পাণ্ডবেরা করলেন ত্রিশের দশকের প্রচলন। তারা ভাল কি খারাপ করেছেন তার বিবেচনায় যাবার ইচ্ছে আমার নেই, আমার বিবেচনা নতুন একটা ধারা এলো. ওটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই দশকের চর্চাও প্রায় আশি বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। একাডেমিক কিংবা সমালোচকরা এ চর্চা করুন সমস্যা নেই কিন্তু কবিদের এ চর্চা থেকে বেড়িয়ে আসা উচিত। কেন এ চর্চা বিগত দশক গুলো সর্বজন স্বীকৃত আলাদা কণ্ঠস্বরের জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়েছে তথাকথিত কিছু কবি লেখকের দলবাজির চর্চা ছাড়া। আমরা অনেক সময় ভেবে দেখিনা দশকচ্যুত বলে যাকে অগ্রাহ্য করা হয় সে প্রকৃতার্থে তার দশকের সেরা কবি কিনা?

তাই আমার বিশ্বাস বিদ্যমান দশকচর্চা পদ্ধতিতে লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। দশকের হরিদাস পালে একদল ভেড়া ঢুকে যায়, যাবেই- কেননা আগেও গিয়েছিল; এটা ঠেকাবার নয়। দলবদ্ধ হয়ে চলার চর্চা লেখকের নিজের শক্তি কমাতে যথেষ্ট যদিও এটাই এ অঞ্চলের কবি লেখকের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দশকচর্চা এরপরও চলবে কেননা সমালোচনা সাহিত্যে অনেক আরামের জন্ম দিয়ে গেছে দশকীয় প্রবণতা। সমালোচনার নতুন কোন পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি না আসা পর্যন্ত একে ধারণ করে যাবেই আমাদের সাহিত্য। তবে কবির তা মান্য করার কিছু নেই বলেই মনে করি। ধরা যাক আজকে বাংলা কবিতার প্রধান চর্চা কেন্দ্র গুলো- কলকাতা, ঢাকা, আগরতলা, আসাম, রাজশাহীতে যে চর্চা, যে ভাষা, যে প্রকাশভঙ্গী মেনে লেখা হয় ওটাকে মানদণ্ড ধরে তালই মিলিয়ে গেলেই মহাকাল একজন কবিকে রাখবে তার সোনার তরীতে? আমার কখনোই তা মনে হয় না, তাই আমি বিশ্বাস করি কবিকে কবিতা লিখতে হলে, আধুনিক হতে হলে তার নিজের সুর নিজেই তৈরি করতে হবে। যা হবে একেবারেই আনকোরা, নতুন কোন আনন্দের মত, একদম জীবন্ত ।

প্রশ্ন: বর্তমান পাঠকদের অভিযোগ শূন্য দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত কবিদের কবিতা দুর্বোধ্যতার কারণে কবিতা পাঠকের সংখ্যা ও কাব্যগ্রন্থের কাটতি হ্রাস পেয়েছে , এই অভিযোগে আপনার মূল্যায়ন কী?

 

আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে আমার একটি প্রশ্ন আপনার কাছে, কবিতা কবে সুবোধ্য, তরল সহজ পাচ্য ছিল ? মাইকেল মধুসূদন কে তার সময়ে কিংবা এখনো পরিপূর্ণ রূপে বুঝেছে, সোনার তরী নিয়েই বা কেন দুর্বোধ্যতার অভিযোগ ? কবিতায় যদি শক্তি থাকে আর তা যদি কবিতা হয়ে ওঠে পাঠমাত্র তাকে হৃদয়ঙ্গম করার কথা নয় পাঠকের। তার ভাঁজ খুলতে একটু সময় লেগেই যায়। আর আপনি প্রশ্নে যে বললেন “শূন্য দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত কবিদের কবিতা দুর্বোধ্যতার কারণে কবিতা পাঠকের সংখ্যা ও কাব্যগ্রন্থের কাটতি হ্রাস পেয়েছে” এ কথাটি ঠিক বলে মনে করার মত কোন কারণ নেই, কেননা সত্তর, আশি কিংবা নব্বই দশকে কবিতার বই খুব চলেছে বলে তো জানা যায় না। আর এই দশকে এসে বই যদি না চলে তবে তার সমূদয় দায়দায়িত্ব সমন্বয়হীন বিপণন ব্যবস্থাকে দেয়া উচিত, কেননা কবি মাথার চুল ছিঁড়ে, কালি ও কাগজ নষ্ট করে লিখবেন, পাণ্ডুলিপি বানাবেন, প্রুফও ক্ষেত্রবিশেষে দেখবেন,  টাকা ঢেলে বই ও করবেন আবার মার্কেটিং এর কাজটাও করে দেবেন এত ঝামেলা করার চেয়ে এক টিকেটে দুই ছবি দেখাও ভালো। বিষয়টা হতাশাজনক কিন্তু উত্তরণের পথও চোখে পড়ে না। 

প্রশ্ন:আর কবিতার সুবোধ্য হলেই বলে (কেউ কেউ) সনাতন ধর্মী কবিতা ,এটা কিভাবে দেখছেন ?

 

কবিতার সংজ্ঞা বিষয়ে আমার ধারণাটা আগে বলতে চাই। কবিতা কবির নির্মাণের বিষয়।  নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, বক্তব্য, চিত্র ও দৃশ্য নির্মাণে কৌশলে যথাযথ ভাব বজায় রেখে কোন কবি যদি কবিতার দেশজ, বৈশ্বিক এবং সময়গত কাঠামো স্পর্শ করে যান, তবেই কবিতা প্রকৃত অর্থে কবিতা হয়ে উঠবে, এ কবিতা সব সময়ের, সব কালের। এ কাল হতে পারে সমসাময়িক, ভূতপূর্ব সময়ের বয়ান কিংবা আগামী দিনের কথকতা। সমাজ, রাষ্ট্র, দর্শন, ধর্ম এবং সর্বোপরি মানুষ- কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ কাঠামো, এগুলোর যথাযথ মেলবন্ধনই কবিতার জন্ম দেয়, হতে পারে তা আকস্মিক কিংবা দীর্ঘদিনের সুচিন্তিত প্রচেষ্টায় নির্মিত।  কবিতা যদি কবিতা হয়ে ওঠে তবে তার সম্পর্কে সুবোধ্য বা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠা কথাটা নিতান্তই অর্থহীন। কবিতা কবিতাই, তাকে সুবোধ্য বা সেকেলে বলে যারা খারিজ করবেন তারা নিজেরা অচিরেই খারিজ হয়ে যেতে পারেন।

প্রশ্ন:বাংলা সাহিত্যকে আমরা দুইটি ভাগে ভাগ করেছি - বাংলাদেশ আর কলকাতা। এই দুই বাংলার সাহিত্যের মাঝে কোনো মিল বা অমিল আছে ? এরা কি একই সুতায় বাঁধা ?

 

আমার জানামতে বিশ্বের যেখানেই বাঙালি আছেন সেখানেই বাংলার চর্চা চলছে। এই যে আমি এখন জার্মানিতে আছি যতদূর জানি এখানেও যারা আছেন তারা বেশ ভালোভাবেই বাংলা সংস্কৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কিছুদিন আগে বার্লিন থেকে ফোন পেলাম কবিতা পাঠের আমন্ত্রণের। অতএব মূল বিষয়টা ভাষা। বাংলা একটাই ভাষা, যে যেখানে যেমন করে বাংলা ভাষায় সাহিত্যের চর্চা করছেন তাই বাংলা সাহিত্য। এর দুই বা দশভাগ নেই। ইংরেজি বা স্প্যানিশ সাহিত্য যেমন, পুরো বিশ্বের ক্ষেত্রেই একটাই। তবে কলকাতার যে প্রকাশ, ঢাকার যে প্রকাশ দুটো এক হবার কোন কারণ নেই, কেননা সাহিত্য পারিপার্শ্বিকতার অভিজ্ঞতা জাত। আমি আগেও একবার বলেছিলাম, সীমান্ত দুই শহরকে আলাদা পরিচয় দিয়ে গেছে, যদিও সীমান্তের সাহিত্যবোধ নেই।

প্রশ্ন:কবিতায় কোন বাংলা এগিয়ে - এপার বাংলা নাকি অপার ?

 

এই প্রশ্নটি সাহিত্যের মত একটি জায়গায় ঠিক যুতসই নয়। কবিতাকে বিচারের ম্যান দণ্ড নিজেই নড়বড়ে, জায়গা ভেদে নিজেকে বদলে নিতে ওর জুড়ি নেই। তবে সাম্প্রতিক চর্চায় দেখা যাচ্ছে এপারের তরুণদের উপর ওপারের ভাষা, বুনন, বিন্যাস একটা প্রভাব ফেলে ভিন্ন কিছুর জন্ম দিচ্ছে কিন্তু ওপারে তেমন করে এপারের প্রভাব পড়ছে বলে মনে হয় না। এতে কার শ্রীবৃদ্ধি ঘটল কার কমল সেটাও বোঝা যাবে বছর ২০ পর।

প্রশ্ন:বাংলা সাহিত্যের উত্তরাধুনিক পর্বে আমরা উপস্থিত হয়ে কবিতার শিল্প আর সৃষ্টি নিয়ে ব্যাপক হইচই আলোচনা -তর্ক -বিতর্ক চলছে। এখানে আপনার বক্তব্য কী?

 

উত্তরাধুনিক নিয়ে অযথা বাগাড়ম্বর না করে বিগত হাজার বছরের না হোক অন্তত দেড়শ বছরের বাংলা কবিতার ইতিহাস পাঠ করে এলেই কেমন কবিতা লিখলে নিজেকে মহাকালের গ্রাস থেকে বাঁচানো যাবে, এটা যে কোন কবি বুঝে যাবেন। সেই বোঝাবুঝিটাই আগে দরকার, আকাশে পাখিরা ধর্মঘট করতে চাইলে আমরা বাধা দেবার কে ? কবিতা না বুঝে কেউ উত্তরাধুনিক হতে চাইলে আমিই বা কে মানা করার ?

প্রশ্ন:বর্তমান বাংলাদেশের কোন কোন কবিদের কবিতা আপনার কাছে উৎকৃষ্ট বলে মনে হয় ?

 

আমার ফেসবুকে বন্ধু আছে প্রায় তিন হাজার। সবাইকে যদি নাম ধরে বলি উৎকৃষ্ট কবি, তাহলে যারা বন্ধু তালিকায় নেই তারা আমার মুণ্ডপাতের চেষ্টা করবেন। তাতে আমার খুব একটা কিছু না এসে গেলেও এই যন্ত্রণা দেখতে ভালো লাগবে না। তাই এই প্রশ্নের উত্তর দিলাম না।

প্রশ্ন:আপনি কি মনে করেন ,বাংলা সাহিত্য এখন ঠিক পথেই এগুচ্ছে ?

 

হ্যাঁ, ভালোই এগুচ্ছে আমি মনে করি। আমি সবসময়েই আশাবাদী একজন লোক। নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়েও আমি আশাবাদী। নেট, ব্লগ, ব্লগজিন কবিতার পাঠক বাড়াচ্ছে, বাংলা ভাষাভাষীদের মিথস্ক্রিয়া বাড়াচ্ছে। সামগ্রিক অর্থেই সুখকর বিষয়টা।

প্রশ্ন: আল মাহমুদের পরে নাকি বাংলা কবিতায় খরা চলছে , আপনার কী মনে হয় ?

 

যারা এমন মনে করেন তাদেরকেই একথা জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়। আসলে আমাদের দেশে কিছু কিছু কবি আছেন যাদের কিছু আত্মস্বীকৃত মুরিদ আছেন, তারা এমনটি ভাবেন। বিপরীত দল আবার আল মাহমুদকে কবিই মনে না করার বালখিল্য প্রদর্শন করতে আগ্রহী। এই চর্চা অবশ্য পৃথিবীর সর্বত্রই কম বেশি দেখা যায়, তবে বাংলাদেশের মত একান্তই বিরল।

প্রশ্ন: উদীয়মান তরুণ কবিদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

 

উদীয়মান তরুণ কবি কথাটা আমায় কেন যেন হাসি পাইয়ে দেয়। আজকাল নানা প্রকারে নিজেকে ওঠাতে হয়, কোথায় সেটা অবশ্য জানা নেই। তরুণ কবি চাঁদ ও না, সূর্য ও না, তাই তার নিজেকে ওঠাবার দিকে নজর না দিয়ে লেখার দিকে নজর দেয়া উচিত। আর একলা চলার মন্ত্র শেখা উচিত। তরুণ কিংবা বৃদ্ধ কাউকেই উদ্দেশ্য করে বলছি না, তবে বলছি- নিজেকে জানো এবং একলা চলো...

 

 

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত